নবিংশ শতাব্দীর একটা সময় থেকে শুরু করে আজ অবধি বহু মানুষের কাছেই রেসের মাঠ এক ‘নিষিদ্ধ’ শব্দ। অথচ সিনেমায়, গল্পে, উপন্যাসে বারবার রেসকোর্সের দৃশ্য দেখানো হয়েছে; ছড়িয়ে-ছিটিয়ে হলেও ঘোড়-দৌড়ের নানান ছবি উঠে এসেছে এইসব মাধ্যমে। এদের কাছে কলকাতার রেসের মাঠের ঘোড়-দৌড় হচ্ছে লেগাসী, অ্যা রয়্যাল লেগাসী! আসলে কলকাতার রেসের মাঠের পরতে-পরতে জড়িয়ে রয়েছে এক ইতিহাস, ঐতিহ্য, এক গভীর সম্ভ্রমের মায়াজাল। রেসের মাঠে লেখক সমরেশ মজুমদারের বেশ ঘনঘন আসা যাওয়া ছিল, আর সে অভিজ্ঞতা নিয়েই লিখে ফেলেছিলেন আস্ত একখানা উপন্যাস ‘দৌড়’। ভারতবর্ষের ঘোড়ার দৌড়ের ইতিহাস নিয়ে জিন ডিয়াস লিখেছিলেন একখানা গোটা বই, যার নাম দিলেন ‘Horse Racing in India: A Royal Legacy’। জন্মসূত্রে ভদ্রলোক আমেরিকার অধিবাসী, আর পেশাগতভাবে একজন ব্রিজ প্লেয়ার। ভাবলে অবাক লাগে অমন একজন বাজখাঁই লেখকের সঙ্গে দূর-দূরান্ত পর্যন্ত কোনও সম্পর্ক ছিল না ভারতবর্ষের। সে যাই হোক পথচলতি প্রায় সব বাঙালির মুখেই যেন প্রবাদ রটে গেছে রেসের মাঠ যতটা দেয় তার থেকে উসুল করে নেয় অনেক বেশি। বিচিত্র এইসব রেসের মাঠের মানুষজন আর বিচিত্র তাঁদের অভিজ্ঞতা। সে যেন এক অনন্য জগৎ।

আর এইসব বিচিত্র মানুষদের বিচিত্র শখ পূরণের জন্য ১৮২০ সালে খাস কলকাতা শহরে ‘রয়্যাল ক্যালকাটা টার্ফ ক্লাব’এর পরিচালনায় উদ্বোধন করা হয় ভারতের বৃহত্তম রেসকোর্স। বহু বিখ্যাত রথীমহারথীর বাঘা বাঘা ঘোড়ারা দৌড়েছে এখানে। এখনও দৌড়চ্ছে।

পুরাণ-সাহিত্য পড়লে জানা যায় অশ্বমেধের যজ্ঞের ঘোড়াকে কেন্দ্র করে ক্ষমতা প্রদর্শন করার কথা। ঠিক তেমনই প্রাচীন ভারতবর্ষেও ঘোড়া ছিল ক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যম। চন্দ্রগুপ্তের সেনাবাহিনীতে ছিল লক্ষাধিক অশ্বারোহী সেনা। সুলতানি আমলে ঘোড়া ছিল সাম্রাজ্যের নীতিনির্ধারক। আর সেকারণে সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি বাজারে ঘোড়ার দাম বেঁধে দিয়েছিলেন। যে সময়টার কথা বলছি, সেই সময়ে ঘোড়া আমদানি করা হত পারস্য থেকে। তৎকালীন দিনে ভালো ঘোড়ার দাম ছিল একশো স্বর্ণমুদ্রা। মধ্য যুগে দক্ষিণ ভারতের অন্যতম প্রসিদ্ধ নগরী ছিল বিজয়নগর সাম্রাজ্য, আর এখানে ঘোড়া আসতো সুদূর পর্তুগাল থেকে। অর্থাৎ বোঝাই যাচ্ছে, ভারতের ইতিহাসে রাজ-রাজাদের অবসর সময়ে বিনোদন থেকে শুরু করে যুদ্ধবিগ্রহ সবকিছুতেই ঘোড়ার অবদান ছিল বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

রাজতন্ত্র থাকতে থাকতে সেই ঘোড়-দৌড়কে ব্রিটিশরা এক নতুন আঙ্গিকে পেশ করলেন। ‘হর্সরেস’এর প্রবণতা যত বৃদ্ধি পেতে শুরু করল হর্সরেস ঘিরে শুরু হল বাণিজ্যিক জুয়া। ১৭৭৭ নাগাদ মাদ্রাজে সর্বপ্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোড়া-দৌড় অনুষ্ঠিত হয়। তারপর ১৮০০ সালে বোম্বাইতে চার্লস ফোবস, জি হল প্রমুখের সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠা হয় বোম্বাই টার্ফ ক্লাবের।

কলকাতা তথা বাংলায় ঘোড়-দৌড়ের সূচনা তুলনামূলক দেরিতে, মোটামুটি পলাশির যুদ্ধেরও পরবর্তী সময়ে। ১৭৬৯ সালে কলকাতা শহরে ‘আকরা’ নামে এক জায়গায় ইংরেজদের বেসক্যাম্পে ঘোড়ার দৌড় আয়োজন করা হয়। সম্ভবত এটিই বাংলার প্রথম ঘোড়-দৌড়। ইতিমধ্যে লর্ড ওয়েলেসলি কলকাতায় আসলেন গর্ভনর জেনারেল হয়ে। তিনি আবার ছিলেন ঘোর পশুপ্রেমী। আর তাই ১৭৯৮ সাল নাগাদ ওয়েলসলি ঘোড়ার দৌড় নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। 

এরপর ১৮১২ সাল নাগাদ বেঙ্গল জকি ক্লাবের উদ্যোগে গড়ে তোলা হয় রেসকোর্স। স্বাধীনতার ঠিক একশো বছর আগে ১৮৪৭ সালে ক্যালকাটা টার্ফ ক্লাবের তত্ত্বাবধানে রেস পরিচালনা করে পাঁচজন স্টুয়ার্ড। এরপরে অবশ্য ক্যালকাটা টার্ফ ক্লাবের দায়িত্ব গ্রহণ করেন স্যর উইলিয়াম ম্যাকফেরসন। এরই মধ্যে একদিন ইংল্যন্ডের রাজা পঞ্চম জর্জ এলেন কলকাতা রেসকোর্সের মাঠে রানি মেরিকে নিয়ে। তাঁরই ইচ্ছায় সে বছর থেকে ‘ক্যালকাটা টার্ফ ক্লাব’এর নাম হল ‘রয়্যাল ক্যালকাটা টার্ফ ক্লাব’। সময় যত গড়াতে থাকে, ততই জনপ্রিয় হতে থাকে এই নতুন খেলা। ১৮৭২ সাল নাগাদ প্রথম মুনসুন রেস চালু হল। ১৮৮০ সাল থেকে সকালের বদলে দুপুরে রেস করার সিদ্ধান্ত নিল কর্তৃপক্ষ আর তার সঙ্গে সেই বছরই প্রথমবার পোলো খেলার আয়োজন করা হয়।

রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ সিংহাসনে বসেন ১৯৫২ সালে। তার পরের বছর থেকে শুরু হয় কুইন্‌স কাপ। বাকিংহাম প্যালেসের সিলমোহর লাগানো চিঠি আসতেই শুরু হয়ে যায় দৌড়ের প্রস্তুতি। রানির প্রতিনিধি হিসেবে দিল্লি থেকে আসেন ব্রিটিশ হাই কমিশনার। রত্নখচিত ১০০ গিনির মূল্যের রাজকীয় কাপটি তিনি তুলে দেন বিজয়ী ঘোড়ার অভিভাবকের হাতে। শহরে ঘোড়-দৌড়ের বড় আসরের মধ্যে রয়েছে বছরের প্রথম দিন, দু’টি ডার্বি এবং এই কুইন্‌স কাপ।

শেষ করার আগে রেস আর রেসের মাঠের কিছু নিয়মকানুন বলে দিই। রেসে দৌড়ানো ঘোড়া এবং তার জকিদের নিজস্ব নাম রয়েছে। বিনা অনুমতিতে যেকোনো জায়গায় ঢুকে পড়া অথবা ছবি তোলা একেবারেই নিষিদ্ধ। মাঠের হিসেবে, যেমন ১১০০ মিটার, ১২০০ মিটার, ১৪০০ মিটার কিংবা ১৬০০ মিটার হিসেবেও যেমন খেলা হয়, তেমনি ঘোড়ার ওপর বাজি ধরে বা জকির ওপর বাজি ধরে খেলাও হয়। ন্যূনতম দশ টাকা দিয়ে শুরু হয় এই বাজি ধরার খেলা। প্রত্যেকটা খেলার জন্য রয়েছে আলাদা আলাদা টিকিট। দৌড়ানোর জন্য এই এক একটা ঘোড়ার দাম ধার্য হয় পারিবারিক ইতিহাস অথবা রেসের ফলাফলের ভিত্তিতে। ৫০ হাজার থেকে ৫০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত হতে পারে ওদের দাম। শুধুমাত্র রেসের জন্য থরোব্রেড প্রজাতির ঘোড়ার প্রতিপালন করা হয় মুম্বই, পাঞ্জাব, হরিয়ানার খামারে। এক জন মালিক পছন্দমত ঘোড়াটি কিনে তার অভিভাবকত্ব পান। তিন বছর বয়স থেকে প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারে এই ঘোড়াগুলি। আয়ু বড়জোর ২৪।

ঘোড়ার বয়স মাপার এক অদ্ভুত নিয়ম আছে। জানুয়ারি থেকে জুনে জন্মানো সব ঘোড়াকেই পরের পয়লা জানুয়ারিতে এক বছরের বলা হয়। দৌড়ের সময় জকির ওজনের সঙ্গে প্রয়োজন মতো ঘোড়ার সাজ মিলিয়ে ভার চাপানো হয় ঘোড়ার পিঠে। ঘোড়ার ক্ষমতা পরীক্ষা করে বিজ্ঞানসম্মতভাবে কাজটি করেন একজন হ্যান্ডিক্যাপার। সব মিলিয়ে এই ওজন হয় ৫০-৬২ কেজির মধ্যে। রয়্যাল ক্যালকাটা টার্ফ ক্লাবের নিজস্ব আস্তাবলে রেখে এইসব ঘোড়াদের থাকা-খাওয়া-কসরত সবই চালানো হয়। খাবার বলতে ওটস, মিলেট, যব, বার্লির মতো খাবার দেওয়া হয়। তবে ওদের মূল খাবার ঘাস। আর তার সঙ্গে প্রশিক্ষকের নজরদারিতে চলে দৌড়বীর ঘোড়াদের প্রশিক্ষণ। একজন অ্যাথলিটের মতোই চলে দৌড়, সাঁতার বা লাফানোর ব্যায়াম।

এইসব ঘোড়ার জকিদের বেতনও হয় লক্ষাধিক টাকা। তার সাথে অবশ্য থাকে মোটা টাকার ইনসিউরেন্স। ঘোড়া থেকে পড়ে যদি কোনো জকি মারা যান, তাঁর পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয় ইনসিউরেন্সের টাকা। রেস চলাকালীন ঘোড়ার সঙ্গে পাশের ট্র্যাকে ঘোরে প্রাইভেট নার্সিংহোমের অ্যাম্বুলেন্স এবং বিচারকের গাড়ি। কেউ ঘোড়া থেকে পড়ে জখম হলে তাকে সঙ্গে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালে।

রেসের মাঠে দৌড়েছে ভারতের অনেক দিকপালের ঘোড়াই। আর সে তালিকায় নাম রয়েছে নামী-দামী ক্রিকেটার, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বিজয় মালিয়ার মত প্রভাবশালীর।


তথ্যসূত্র: