দৈনন্দিন জীবনে পিঁপড়ে আমাদের সকলের কাছে খুব পরিচিত একটি প্রাণী। অফিস, বাড়ি, গ্রাম, শহর প্রায় সর্বত্র এই জীবের বসবাস। সাধারণত কালো পিঁপড়ে, কিংবা লাল বা বাদামি পিঁপড়েই আমাদের বেশি চোখে পড়ে। তবে পিঁপড়ে নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা দক্ষিণ আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মত জায়গায় নীল, হলুদ বা সবুজ পিঁপড়ের সন্ধানও পেয়েছেন। বলা হয় এই বিশ্বে নাকি কুড়ি হাজারেরও বেশি পিঁপড়ের প্রজাতি আছে। এই সমস্ত প্রজাতির ওপরে দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষা নিরীক্ষা করার পর জানা গেছে একাধিক আকর্ষণীয় তথ্য।

যেমন প্রথমেই বলি ‘ফাইন্ডিংস’ নামে একটি জার্নালে প্রকাশিত খবরের কথা। ২০১৭ সালে প্রকাশিত সেই খবরে নাম ওঠে এডিনবার্গস স্কুল অব ইনফর্মাটিক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর বারবারা ওয়েবের। ওয়েবের নেতৃত্বে একটি দল পিঁপড়ের ওপর গবেষণা করে জানতে পেরেছে পিঁপড়ের মস্তিষ্ক ক্ষুদ্র হলেও, নানা কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে খুব সহজেই জায়গা চিনে তারা নিজের গন্তব্যে পৌঁছোতে পারে। শুধু তাই নয়, মানুষের চিন্তাভাবনার থেকে অনেক বেশি বাস্তবজ্ঞান-সম্পন্ন তারা। খাবারের আকার খুব ছোট হলে পিঁপড়েরা তা সামনের দিকে বয়ে নিয়ে যায়। আবার খাবার যদি ভারী ও বড় হয় তাহলে তারা পিছনের দিক করে নিয়ে যায়। পিছনের দিক করে নিলেও কিন্তু কোনো ভুলভ্রান্তি না করেই তারা পৌঁছে যেতে পারে তাদের গন্তব্যে।

পিঁপড়ে তার মুখে করে খাবার নিয়ে চলেছে

মনে করা হয় পিঁপড়ে তার শরীরের ওজনের চেয়ে ২০ গুণ বেশি ওজন বহন করতে পারে! ভারী খাবার বয়ে নিয়ে যাওয়ার সময়, মাঝে মাঝে সূর্যের অবস্থান ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশকেও লক্ষ্য করে তারা। পিঁপড়ের কান নেই। পিঁপড়ের হাঁটু এবং পায়ে আছে বিশেষ এক ধরনের সেন্সিং ভাইব্রেশন প্যাড যার মাধ্যমে আশেপাশের পরিস্থিতি পিঁপড়েরা বুঝতে পারে। পিঁপড়ের দেহ থেকে ফেরোমন নামে একপ্রকার হরমোন নিঃসরণ হয়, যা পিঁপড়ের দলকে সারিবদ্ধভাবে পথ অনুসরণ করতে সাহায্য করে। কোনো পিঁপড়ে যখন মারা যায়, তখন তার শরীর থেকে এই ফেরোমন নির্গত হয়। এর ফলে দলের অন্য পিঁপড়েরা সহজেই সেই ‘মৃত্যুসংবাদ’ পেয়ে যায়।

পিঁপড়ের সারি

পিঁপড়ের মস্তিষ্কের আয়তন একটি আলপিনের মাথার থেকেও ছোটো। সম্প্রতি একধরনের কাঠপিঁপড়ের উপর পরীক্ষা চালিয়ে গবেষকরা দেখেছেন এই প্রাণীর মস্তিষ্কের দুদিকে আছে দুধরনের স্মৃতির ভাণ্ডার। একদিকে জমা থাকে তাৎক্ষণিক কিছু স্মৃতি– যে স্মৃতি কয়েক মিনিট বা কয়েক ঘন্টার মধ্যে মুছে যায়। আর অন্যদিকে জমা থাকে দীর্ঘ স্মৃতি, যা বহুদিন পর্যন্ত জীবন্ত থাকে। এই ঘটনাকে বিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন ‘নিউরাল ল্যাটারালাইজেশন’।

এই পরীক্ষাটি করা হয়েছিল ফর্মিকা রুফা নামের একধরনের কাঠপিঁপড়ের ওপর। একটি ছোটো ঘরে খাবারের পাত্র সাজিয়ে নীল বাল্ব জ্বালিয়ে ফর্মিকা রুফা কাঠপিঁপড়েকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এদের মধ্যে কিছু পিঁপড়েকে খাবারের সংকেত দেওয়া হয়েছিল বাম মস্তিষ্কে আর বাকিদের খাবারের সংকেত দেওয়া হয়েছিল ডান মস্তিষ্কে। পরীক্ষার পর দেখা যায়, যাদের ডান মস্তিষ্কে সংকেত দেওয়া হয়েছিল তারা মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যে সংকেত ভুলে গিয়েছে। কিন্তু যাদের বাম মস্তিষ্কে সংকেত দেওয়া হয়েছিল তারা একদিন পরেও তা মনে রেখেছে। এই ঘটনা থেকে প্রমাণ হল পিঁপড়ের বাম মস্তিষ্কে জমা থাকে দীর্ঘদিনের স্মৃতি, আর ডান মস্তিষ্কে থাকে কিছু তাৎক্ষণিক স্মৃতি।

ইথাইল গ্যালেট রঞ্জকে রঞ্জিত পিঁপড়ের মস্তিষ্কের প্রস্থচ্ছেদ। (AL: antennal lobe; CC: central complex; DL: dorsal lobe; la: lamina; lCa: lateral calyx; ld: lower division; lo: lobula; LP: lateral protocerebrum; M: medial; MB: mushroom body; mCa: medial calyx; me: medulla; mL: medial lobe; OL: optic lobe; Pe: peduncle; SEG: subesophageal ganglion; ud: upper division; V: ventral; vL: vertical lobe)

মানুষের মস্তিষ্ক, চিন্তাশক্তি বা বুদ্ধিমত্তা নিয়ে গবেষণার অন্ত নেই। কিন্তু গত এক দশক ধরে পিঁপড়ে বা ঐজাতীয় অমেরুদণ্ডী প্রাণীর আচরণ নিয়ে বিজ্ঞানীদের মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। এডিনবার্গস স্কুল অব ইনফর্মাটিক্স বিশ্ববিদ্যালয়, লিঙ্কন বিশ্ববিদ্যালয়, অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বা ফ্রেঞ্চ ন্যাশনাল সেন্টার ফর সায়েন্টিফিক রিসার্চ (CNRS)-এর মতো খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়গুলি পিঁপড়ের ওপর তাদের গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যেই পিঁপড়ের মস্তিষ্কের নিউট্রাল সার্কিট মডেল তৈরিতে গবেষকরা সক্ষম হয়েছেন। বিজ্ঞানীরা আশাবাদী যে নতুন কম্পিউটার অ্যালগরিদম তৈরির ক্ষেত্রে, কিংবা তা রোবটে ব্যবহার করার জন্য পিঁপড়ের মস্তিষ্ককে কাজে লাগানো যেতে পারে। এই নতুন চিন্তাভাবনা সফল হলে রোবট গবেষণায় আমুল পরিবর্তন হতে পারে বলে স্বপ্ন দেখছেন বিজ্ঞানীরা।

তথ্যসূত্র:

বুদ্ধির বৃহস্পতি! পিঁপড়ের মস্তিষ্ক রোবট গবেষণার দিশা দেখাবে, আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৩ জানুয়ারি, ২০১৭
দুধরনের স্মৃতি সংরক্ষণে দুটি পৃথক প্রকোষ্ঠ পিঁপড়ের মস্তিষ্কে, গবেষণায় জানা গেল সম্প্রতি
রোবট গবেষণায় নতুন পথ দেখাল পিঁপড়া!
পিঁপড়া সম্পর্কে অজানা তথ্য!
The Color of Ants – Black, Red, Blue, Yellow and Many More!
Ants Use Visual Memory And Sun’s Position To Guide Backwards Walk Home