দূর ভবিষ্যতে যখন-তখন শরীর খারাপে আপনাকে আর জেনারেল ফিজিশিয়ানের কাছে দৌড়তে হবে না। পেট খারাপ থেকে বোন ফ্র্যাকচার, দাঁতে ব্যথা থেকে লাং ক্যানসার – আপনার চিকিৎসার যাবতীয় ভার কাঁধে তুলে নেবে রোবোটই। কী ভাবছেন, সম্ভব কিনা? আজ্ঞে হ্যাঁ। আগামীদিনে রোগ নির্ধারণ হোক বা রোগের চিকিৎসা, যাবতীয় কাজই একজন দক্ষ চিকিৎসকের মত রোবটকে দিয়ে করিয়ে ফেলা সম্ভব হবে। আর বিশেষ করে করোনা বা এইধরনের ছোঁয়াচে রোগের সংখ্যা দিনদিন যত বাড়বে, তাতে যদি রোবটের ব্যবহার করে চিকিৎসাব্যবস্থা সামলানো যায় তাহলে তো কথাই নেই।

এখন প্রশ্নটা হল কীভাবে? আপনি যদি গত কয়েক বছরের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নিয়ে নাড়াচাড়া করে থাকেন, তাহলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI)-এর নাম আপনি নিশ্চই শুনে থাকবেন। ইতিমধ্যে বিভিন্ন দেশ চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করে দিয়েছে। নানা ধরনের রোগ ও সমস্যা সমাধানে AI ব্যবহার করে চিকিৎসকেরা রীতিমত সুফলও পাচ্ছেন।

শুধু তাই নয়, গোটা বিশ্ব জুড়ে এখন AI এবং রোবোটিক্স নিয়ে আলোচনা চলছে জোরকদমে। মার্কিন বিশেষজ্ঞরা কার্ডিয়াক অ্যারিদমিয়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে প্রায় ৯৭% ক্ষেত্রে সফল হয়েছেন। নটিংহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা এই প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে চিকিৎসকদের থেকেও ভালো ও নিখুঁতভাবে হৃদরোগের চিকিৎসার পরিকল্পনা ছকে ফেলেছেন। গুগল আবার AI কে কাজে লাগিয়ে ব্রেস্ট ক্যানসার ও অন্যান্য ক্যানসার যাতে দেহে না ছড়ায় তা নিয়ে দিনরাত কাজ করে চলেছে। শুধু শারীরিক সমস্যাই নয়। ফেসবুকের মত আন্তর্জাতিক সংস্থা AI এর সাহায্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট দেখে আত্মহত্যাপ্রবণ মানুষদের মানসিক সাহায্য করছে। হার্ভার্ড ও ভার্মন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা ইনস্টাগ্রামের পোস্ট দেখেও কেউ অবসাদগ্রস্ত কিনা তা খুঁজে বের করছেন।

তবে শুধুমাত্র বিদেশই নয়। আমাদের ভারতবর্ষেও কিছু কিছু জায়গায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ শুরু হয়ে গেছে। দক্ষিণ ভারতের বেশ কিছু হাসপাতালে রোবটকে দিয়ে স্পাইন সার্জারি করানো গেছে, যা চিকিৎসকদের এই নতুন পদ্ধতি অনুসরণ করতে রীতিমত ভাবিয়ে তুলেছে। ২০১৮ র অক্টোবর মাস নাগাদ কেন্দ্রীয় সরকার পরিচালিত সাফদারজং হাসপাতালে রোবটের সহায়তায় উন্নত চিকিৎসা পরিকাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের দীর্ঘ চার বছরের প্রচেষ্টার ফলে অবশেষে এই রোবট যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে গ্রহণ করা হয়। ইতিমধ্যেই রোবটটি সফলভাবে ২৫ জন রোগীর চিকিৎসা সম্পূর্ণ করেছে। ১৯৯২ সালে আমেরিকায় রোবোডক (ROBODOC) নামক একটি রোবট সফলভাবে হিপ আর্থ্রোপ্লাস্টি সম্পন্ন করে। সরকারের অনুমতি পেলে ভারতেও এই ধরনের রোবোডকের আমদানি করা যেতে পারে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে বা রোবটের মাধ্যমে চিকিৎসা দানের সুবিধাও রয়েছে অনেক। প্রথমত, এই পদ্ধতিতে চিকিৎসার (বিশেষত শল্যচিকিৎসার) একটি বড় সুবিধা হল সার্জারির পর স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসতে রোগীর তুলনামূলক কম সময় লাগে। দেখা গেছে, সাধারণ শল্যচিকিৎসার তুলনায় রোবোটিক শল্যচিকিৎসায় বেশিরভাগ রোগী গড়ে ৫০% দ্রুত হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে যাচ্ছেন। ফলে রোগীর পেছনে পরিবারের খরচও অনেকটা কমিয়ে আনা যাচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, রোবোটিক শল্যচিকিৎসায় যন্ত্রপাতির ওপরে রোবটের বেশি ভালো নিয়ন্ত্রণ থাকে। ফলে একটানা অনেকক্ষণ ধরে অস্ত্রোপচারের জন্য মানুষের পরিবর্তে রোবটকে কাজে লাগানো যেতেই পারে। যেহেতু রোবটগুলি আগে থেকে প্রোগ্রামিং করা থাকে, তাই এগুলি বহু বছর পর্যন্ত একই রকম দক্ষতার সঙ্গে পরিষেবা দিয়ে যেতে পারে।

তৃতীয়ত, চিকিৎসাক্ষেত্রে উপযুক্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত রোবটের দ্বারা ভুল হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। ফলে অপারেশন চলাকালীন যেকোনোরকম দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা যেমন কমে যায়, তেমনি সার্জারির আগে রোগীদের উদ্বেগও কম হয়। বরং অধিক নিখুঁত ও সুষ্ঠুভাবে অস্ত্রোপচার সম্ভব হয়।

আর সবশেষে এই সার্জারির আরেকটা সুবিধা হল রোবটের সাথে উন্নতমানের 3D ক্যামেরা যুক্ত থাকায় শরীরের ভেতরের অনেকটা জায়গার ছবি চিকিৎসকেরা খুব সহজেই কম্পিউটার স্ক্রিনে দেখতে পান। যার ফলে অনেক সহজে এবং দ্রুত চিকিৎসা করা সম্ভব হয়।

রোবটের মাধ্যমে সার্জারি; সূত্র: International Journal of Scientific & Engineering Research, Volume 2, Issue 8
এ তো গেল রোবোটিক সার্জারি ও চিকিৎসার কথা। এসব ছাড়াও হাসপাতালগুলিতে রোগীদের দেখভাল ও রোগীর সুরক্ষা বাড়ানোর কাজেও রোবটগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। হাসপাতাল চত্বর পরিষ্কার রাখা ও ধোয়া-মোছা করা, রোগীদের খাবার পরিবেশন করা, অথবা তাদের জন্য বিছানা তৈরি করা – এই ধরনের অনেক কাজই রোবটকে দিয়ে করিয়ে নেওয়া যেতে পারে। চিনের উহান শহর, যেখান থেকে কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে, সেখানকার একটি হাসপাতালে রোগীদের খাবার দেওয়া, তাপমাত্রা মাপা বা যোগাযোগের মতো কাজে ব্যবহার হচ্ছে রোবট। ‘ক্লাউড জিঞ্জার’ নামে ওই রোবট তৈরি করেছে ক্লাউড মাইন্ডস।

এছাড়াও পরীক্ষামূলক ভাবে রোবটদের দিয়ে ল্যাবরেটরিতে রক্ত ও অন্যান্য নমুনা সংগ্রহ করিয়ে তা থেকে রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা করতে দেওয়া হয়। রোবটগুলি যথাযথ নির্ভুলভাবেই এই সমস্ত কাজ করতে সক্ষম হয়েছে। ব্লাড ব্যাংক থেকে রক্ত এনে হাসপাতালে জমা করা, ICU রোগীদের ২৪ ঘন্টা পর্যবেক্ষণ করা, কিংবা ফার্মেসি কোম্পানিগুলিতে ওষুধের প্যাকেজিং ও ওষুধের হিসেব রাখা – আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এই কাজগুলিও রোবটদের দিয়ে করানো সম্ভব হবে।

এতকিছু সুবিধা পাওয়া গেলে আর গোটা বিশ্বজুড়ে উত্তরোত্তর রোবোটিক্সের চর্চা বাড়তে থাকলে আগামীদিনের চিকিৎসাক্ষেত্রেও রোবোটের আমদানি করাটা কিছুই অস্বাভাবিক নয়। অক্সফোর্ড ও ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণাতেও এমনই তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। তাতে স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয়েছে ২০৫৩ সালের মধ্যে মানুষের চেয়ে মেশিনই চিকিৎসাক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা নেবে। তাই আর কয়েক দশক বাদে হয়তো এমন দিনও আসবে যেখানে ডাক্তারের চেম্বারে ঢুকে আপনি দেখবেন মানুষ নয়, আপনার দিকে এগিয়ে আসছেন একজন রোবট চিকিৎসক।


তথ্যসূত্র: