প
শ্চিমবাংলার লোকশিল্পের রত্নভান্ডার বিষ্ণুপুরে তৈরি প্রাচীন একপ্রকার ওরক বা তাস হল দশাবতার তাস। দশাবতার ভাবনার সূত্রপাত অনেক আগেই, কিন্তু তাকে বিচিত্র রং-রূপে রূপায়িত করে খেলার তাসে পরিণত করার পরিকল্পনা যে কত পুরোনো তা আজও কোনও ঐতিহাসিক বলতে পারেন না। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ১৮৯৫ সালে ‘এশিয়াটিক সোসাইটি জার্নাল’-এ লিখছেন, ‘I fully believe that the game was invented about eleven or twelve hundred years before the present date.’ অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে বিনয় ঘোষ তাঁর ‘পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি’ বইতে বলেছেন, ‘শাস্ত্রী মহাশয়ের বিবরণ সম্পূর্ণ নয় এবং তাঁর বিবরণের সঙ্গে আমাদের বিবরণের পার্থক্য আছে।’
বিষ্ণুপুরের প্রাচীন ইতিহাস অনুযায়ী মল্লরাজাদের সমৃদ্ধিকালে দশাবতার তাস খেলার প্রবর্তন হয়। তৎকালীন বাঁকুড়া, বর্ধমান, বীরভূম, সাঁওতাল পরগনা, মেদিনীপুর ও পুরুলিয়ার কিছু এলাকা নিয়ে গঠিত অঞ্চলের নাম ছিল মল্লভূম। ১৫৬৫ সালের কাছাকাছি কোনো এক সময়ে মল্লভূমের উপর দিয়ে শিষ্যদের নিয়ে গৌড়ের পথে যাচ্ছিলেন বৈষ্ণব গুরু শ্রীনিবাস আচার্য। এমন সময় মল্লভূমের রাজা বীর হাম্বীরের সেনারা শ্রীনিবাসের সেই দলটি আক্রমণ করে। শ্রীনিবাসের সঙ্গে থাকা খাবারদাবার, টাকাপয়সা সমেত তাঁর মহামূল্য অনেকগুলি পুঁথি সেনার দল লুঠ করে সেখান থেকে চম্পট দেয়। লুঠ করা জিনিসগুলির মধ্যে থেকে শ্রীনিবাসের লেখা ‘ভাগবত’ পুঁথি পড়ে ভীষণভাবে উদ্বুদ্ধ হন মহারাজ বীর হাম্বীর। এরপর শ্রীনিবাসকে ডেকে পাঠিয়ে তাঁর কাছে বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করেন তিনি। ‘অহিংসা’ হয় তাঁর মূলমন্ত্র। মল্লভূমে মহারাজ বীরের ৫৫ বছরের শাসনকাল ছিল যেন ইতিহাসের স্বর্ণযুগ। বীরের উৎসাহে তৈরি করা হয় বিষ্ণুপুরের টেরাকোটা মন্দিরগুলির মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ রাসমঞ্চ। শিকার, রক্তপাত বা হিংসা নয়, গুরু শ্রীনিবাসের উৎসাহে মহারাজ বীর তাসের খেলা প্রচলন করলেন মল্লভূমে। তবে এই খেলা রাজা-রানি-জোকার নিয়ে নয়, ভগবান বিষ্ণুর দশ অবতার নিয়ে শুরু হল নতুন তাসের খেলা।
দশাবতার তাস। মৎস্য, কূর্ম, বরাহ, নৃসিংহ, বামন, ভৃগুরাম, রাম, বলরাম, জগন্নাথ এবং কল্কি– বিষ্ণুর দশ অবতারের চিত্র।শ্রীনিবাস ছিলেন উড়িষ্যার মানুষ। শ্রীনিবাসের অনুপ্রেরণায় বাংলায় এই খেলার প্রচলন হলেও, এখানে এসে খেলার নিয়ম কিছুটা বদলে যায়। উড়িষ্যার দশাবতার তাসের একটি সেটে থাকত ১৪৪টি তাস। এই তাসে গণেশ, কার্তিককেও বিষ্ণুর অবতার রূপে ধরা হয়। বিষ্ণুপুরে যে দশাবতার তাসের প্রচলন করা হয় তার একটি সেটে থাকে ১২০ টি তাস। গণেশ-কার্তিকের উল্লেখ নেই। এখানে মৎস্য, কূর্ম, বরাহ, নৃসিংহ, বামন, ভৃগুরাম (পরশুরাম), রাম (রঘুনাথ), বলরাম, জগন্নাথ (বুদ্ধ) এবং কল্কি– বিষ্ণুর এই দশ অবতারের মূর্তি আঁকা থাকে। প্রত্যেক অবতারের আবার ১২টা করে তাস থাকে। তার মধ্যে একটা রাজা ও একটা মন্ত্রী। বাকি দশটায় থাকে অবতারের প্রহরণ বা জ্ঞাপক চিহ্ন। যেমন মৎস্য অবতারের মাছ, কূর্মর কচ্ছপ, বরাহের শঙ্খ বা রামের বাণ এইরকম আরকি। দশাবতার তাস সাধারণত পাঁচজন মিলে খেলতে হয়। মজার বিষয় হল এই খেলা ১০ মিনিটের মধ্যেও শেষ হতে পারে, আবার এক ঘন্টাও লেগে যেতে পারে। সকালে খেলা হলে তাসের রাজা রামচন্দ্র আর রাতে হলে মীন এমনটা ধরে নেওয়া হয়।
এইবারে আসি দশাবতার তাস বানানোর গল্পে। দৃশ্যত সাধারণ তাসের তুলনায় এগুলি যতটা শৌখিন, তার থেকে কয়েকগুণ বেশি শৌখিন এই তাসের কারিগরি। মহারাজা বীর হাম্বীর তাঁর সেনাপতি কার্তিক ফৌজদারকে দশাবতার তাস তৈরির নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাঁর আমল থেকে আজ পর্যন্ত ফৌজদার পরিবার এই কাজ করে আসছেন।
প্রথমে কাপড় তিনভাঁজ করে পরপর সাজিয়ে তেঁতুল বীজের আঠা বা ‘মাড়ি’ দিয়ে সাঁটা হয়। তারপর একাধিকবার খড়িমাটি ও আঠার প্রলেপ বুলিয়ে তা কড়া রোদে শুকিয়ে নেওয়া হয়। এরপর ঝামাপাথর দিয়ে উপরের অংশ যতদূর সম্ভব মসৃণ করা হয়। একে বলে তাসের ‘জমিন’ প্রস্তুত করা, যা বেশ সময়সাপেক্ষ কাজ। জমিন তৈরি হলে তাসের আকার অনুযায়ী সেগুলো বৃত্তাকারে কেটে নেওয়া হয়। বৃত্তাকার এই তাসগুলি ছিল ৪–১০ সেন্টিমিটার ব্যাসযুক্ত এবং ১/৫ ইঞ্চি পুরু। তারপর আরম্ভ হয় আসল কাজ, অর্থাৎ চিত্রাঙ্কন। বিভিন্ন অবতার, তাদের উজির ও প্রতীকচিহ্নসহ দশ থেকে টেক্কা পর্যন্ত সমস্ত ছবি নিপুণ হাতে আঁকা হয়। আঁকা শেষ হওয়ার পর মেটে সিঁদুর আর গালা টেনে ‘পিঠ’ তৈরী করা হয়। দশাবতার তাসের রঙের সামঞ্জস্য ও নকশা থেকে বিষ্ণুপুরের বিখ্যাত তাঁতশিল্পীরা কাপড়ের পাড় তৈরি করতেন। ‘পাটরাঙা’ নামে একটি স্থানীয় তন্তুবায় সম্প্রদায় দেশীয় পদ্ধতিতে বিভিন্ন রঙও তৈরি করতেন।
দশাবতার তাস তৈরি ও চিত্রাঙ্কনের কাজ চলছেসময়ের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যেতে বসেছে দশাবতার তাস ও তাস-শিল্পীরা। বর্তমানে বিষ্ণুপুরের একমাত্র শিল্পী শীতল ফৌজদার এবং তাঁর পরিবারই এই তাসের ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। দশাবতার তাস খেলায় ব্যবহৃত না হয়ে এখন সৌন্দার্যায়নের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিষ্ণুপুরের শিল্পীদের দোকানে এবং পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার পরিচালিত বিশ্ববাংলা আউটলেটগুলোয় এখন এই তাস বিক্রি করা হয়। ১২০ টি তাস নিয়ে তৈরি এক একটি তাসের সেটের দাম মোটামুটি ১০ হাজার টাকা। শিল্পীদের হিসেবে, বছরে খুব বেশি হলে ১০ টি প্যাকেট বিক্রি হয়। হাতে গোনা এইসব ক্রেতাদের মধ্যে বিদেশিদের সংখ্যাই বেশি। হিসেব করলেই বোঝা যায়, শুধুমাত্র তাস বিক্রির টাকায় সংসার চালানো খুবই কঠিন। ফলে অধিকাংশ তাসের শিল্পীরা বেশি উপার্জনের আশায় কখনো ঠাকুর বানান, আবার কখনো অন্য জীবিকার সন্ধান করেন। তাস শিল্পীদের মতে, সরকার বা সাধারণ মানুষ যদি এই ঐতিহ্য সংরক্ষণে উৎসাহী না হন, তবে হয়ত বাংলার এই মূল্যবান ঐতিহ্য একদিন অচিরেই হারিয়ে যাবে।
তথ্যসূত্র:
বিলুপ্তির পথে বাংলার ঐতিহ্য ‘দশাবতার তাস’, খেলেছেন কখনও?



3 মন্তব্যসমূহ
চমৎকার লেখা
উত্তরমুছুনবাহ্, অনেক নতুন তথ্য জানতে পারলাম।
উত্তরমুছুনসবমিলিয়ে খুব ভালো লেখা।
উত্তরমুছুন