কৃত্রিম সূর্য কিন্তু আর একটা সূর্য নয়। সূর্যের মত দেখতেও নয়। কৃত্রিম সূর্য হল আসলে একটা বৈদ্যুতিক চুল্লি। যেটা রয়েছে চীনের একটি পরীক্ষাগারে। বিজ্ঞানীরা বলছেন চীনের বানানো এই কৃত্রিম সূর্য নাকি বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে আসল সূর্যের থেকেও প্রায় ৬-৮ গুণ বেশি তাপমাত্রা উৎপন্ন করতে পারে। 

একটু গোড়া থেকেই শুরু করি। গত প্রায় তিন দশক ধরে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করছেন নিরবিচ্ছিন্নভাবে শক্তি উৎপাদনের পন্থা খুঁজে পেতে। কারণ শিল্পায়নের যুগে প্রতিনিয়ত বিদ্যুতের চাহিদা যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে প্রচলিত শক্তির উৎসগুলি অল্প দিনের মধ্যেই ফুরিয়ে যেতে বসেছে। তাছাড়া এইধরনের উৎসগুলি থেকে বিদ্যুৎ ব্যবহারের ফলে পরিবেশের ক্ষতি, এমনকি বিশ্ব উষ্ণায়নের মত সমস্যাও দেখা দিচ্ছে। এর জন্য ১৯৮৫ সাল থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত প্রভৃতি দেশের বিজ্ঞানীরা ‘ইন্টারন্যাশনাল থার্মোনিউক্লিয়ার এক্সপেরিমেন্টাল রিয়্যাক্টর (ইটের)’ প্রকল্পে গবেষণা করছেন। ২০০৬ সালে চীন এই দলে যোগ দেয়।

আমরা জানি, সূর্যের ভেতর নিউক্লিয়ার ফিউশনের মাধ্যমে প্রচণ্ড তাপ উৎপন্ন হয়। সেই একই নীতি মেনে তৈরি করা কৃত্রিম সূর্যেও হাইড্রোজেনকে ‘গ্রিন এনার্জি’ বা বিদ্যুতে রূপান্তরের প্রক্রিয়া চালানো হয়। এর থেকে উৎপন্ন তাপ নিউক্লিয়ার ফিউশন প্রক্রিয়ার জন্য জরুরি।

এই ধরনের একটি নিউক্লিয়ার ফিউশন রিয়্যাক্টর তৈরির জন্য বিজ্ঞানীরা বছরের পর বছর ধরে চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। অবশেষে গত এপ্রিল মাস নাগাদ চীনের হেফেই ইন্সটিটিউট অব ফিজিক্যাল সায়েন্সের বিজ্ঞানীদের তরফ থেকে এই পরীক্ষায় সফলতার কথা শোনা যায়। যে যন্ত্রটি তারা প্রস্তুত করেছে তার নাম ‘এক্সপেরিমেন্টাল অ্যাডভান্সড সুপার কন্ডাক্টিং টোকামাক’ বা ইস্ট। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করলে কম শক্তি খরচ করে বেশি শক্তি পাওয়া যেতে পারে। পরে এই তাপশক্তি বিদ্যুতে রূপান্তরিত করে আমরা কার্বন নিঃসরণের বিপদমুক্ত বিদ্যুৎশক্তিও পেতে পারি। এর থেকে একদিকে যেমন কয়েক কোটি টাকা মূল্যের পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ ও শক্তি উৎপাদন সম্ভব হবে, তেমনি জলবায়ু পরিবর্তনের সমস্যা থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করা সম্ভব হবে। এই টোকামাকের একটা বড়ো সুবিধা হল এর দ্বারা উৎপন্ন তাপশক্তিতে পারমাণবিক বর্জ্যের সমস্যা নেই এবং আকস্মিক দুর্ঘটনার আশঙ্কা কম।

চীনের পরীক্ষাগারে ‘এক্সপেরিমেন্টাল অ্যাডভান্সড সুপার কন্ডাক্টিং টোকামাক’ যন্ত্র।

দক্ষিণ পশ্চিম চীনের সিচুয়ান প্রদেশে গত বছর শেষ হয়েছে এই রিয়্যাক্টর তৈরির কাজ। চীনের সরকার নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যম ‘পিপলস ডেইলি’ লিখেছে, কৃত্রিম সূর্য চালু করতে খরচ হয়েছে আনুমানিক ২২৫০ কোটি মার্কিন ডলার। এই নতুন প্রযুক্তির ফলে শুধু যে দেশের বিদ্যুৎশক্তির কৌশলগত চাহিদা মিটবে তাই না, ভবিষ্যতে শক্তি ও জাতীয় অর্থনীতিতেও এ এক বিরাট অবদান রাখবে। বিজ্ঞানীদের দাবি, এক দশকের মধ্যেই নিজের পূর্ণ ক্ষমতা দেখাতে পারবে এই রিয়্যাক্টর। চীনের প্রায় ৩০০ জন বিজ্ঞানী ও ইঞ্জিনিয়ার কাজ করে যাচ্ছে এই অভিনব যন্ত্রটির উন্নয়নে।

টোকামাক যন্ত্রের কার্যপদ্ধতি।

ইতিমধ্যেই প্রমাণ পাওয়া গেছে এই কৃত্রিম সূর্য সর্বোচ্চ ১২ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপ উৎপন্ন করতে পারে, যা সূর্যের কেন্দ্রের তাপমাত্রার ৮ গুণ! শুধু তাই নয়, মাত্র ২০ সেকেন্ডের জন্য ১৬ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা উৎপন্ন করতেও সক্ষম হয়েছে চীনের এই যন্ত্র। এই যন্ত্র মূলত গরম প্লাজমাকে দ্রবীভূত করে একটি শক্তিশালী চৌম্বকীয় ক্ষেত্র তৈরি করে, তাই এর থেকে এত উচ্চ তাপমাত্রা উৎপন্ন হতে পারে। আপাতত আরও দীর্ঘ সময়ের জন্য এই ধরনের উচ্চ তাপমাত্রা উৎপন্ন করাই বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য। এককথায় বলা যেতে পারে, ভবিষ্যতে এইধরনের কৃত্রিম সূর্যের কার্যকারিতা প্রমাণ হলে শক্তি উৎপাদনের ক্ষেত্রে কী কী পরিবর্তন আসতে পারে সেদিকেই তাকিয়ে থাকবে গোটা বিশ্ব।

তথ্যসূত্র: