যেদিকে চোখ যায়, শুধুই বালি আর বালি। আমরা এখন রয়েছি রাজস্থানের থর মরুভূমির মাঝে। ভারতবর্ষের শুষ্কতম স্থান হিসেবে থর মরুভূমির নাম সকলেরই পরিচিত। দুপুরবেলা রোদের হল্কা আর বালুঝড়ে মরুভূমি থাকে একেবারে জনমানবশূন্য। দিনের বেলায় কোনো কোনো বছর সর্বোচ্চ তাপমাত্রা সেঞ্চুরিও করেছে। সেই মরুর মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে বিশাল এক কেল্লার মাপে বাড়ি। মরুভূমির উষ্ণ আবহাওয়াকে একপ্রকার বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মাসের পর মাস এই বাড়িতে বজায় থাকে শীতল, মনোরম পরিবেশ।

রাজকুমারী রত্নাবতী গার্লস স্কুল। বালু রাজ্য রাজস্থানের থর মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে রয়েছে হলুদ বালিপাথরের তৈরি এই অত্যাধুনিক পরিকাঠামো। কোনোরকম শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র ছাড়াই এই স্কুলের ভেতরকার পরিবেশ থাকে শীতল। স্কুলটির আকৃতি মূলত ডিম্বাকার। চারদিক দিয়ে ঘেরা স্কুলের মাঝখানে আবার খেলার মাঠও রয়েছে। অফ্ পিরিওডে পড়ুয়ারা নিশ্চিন্তে স্কুলের মাঠে খেলাধূলার সুযোগ পায়।

রাজকুমারী রত্নাবতী গার্লস স্কুল

এবার আসি এই ঘটনার রহস্যটা কী তার উত্তরে। মরুভূমির মত রুক্ষ, শুষ্ক পরিবেশে এরকম একটা ঠাণ্ডা ঘর বানানো কি সত্যিই বিজ্ঞানসম্মত? আসলে স্কুলটা যে হলুদ বালিপাথর দিয়ে তৈরি করা হয়েছে তার জন্য পরিবেশে কার্বন অনেকটাই কম নির্গত হয়। ফলে স্কুল এবং স্কুলের আশেপাশের পরিবেশ তুলনামূলক অনেক ঠান্ডা থাকে। প্রকৃতির নিয়ম অনুসারে মরুভূমির পরিবেশ রাতে ঠান্ডা এবং দিনে গরম থাকে। সেই ঘটনাকে মাথায় রেখে স্কুলের গঠন এমনভাবে করা হয়েছে, যাতে রাতের ঠান্ডা হাওয়া দিনভর স্কুলের ভিতরে আটকে থাকতে পারে। স্কুলের মাঠে, ছাদে সর্বত্র সোলার প্যানেল বসানো রয়েছে, যার থেকে নিরবচ্ছিন্ন ভাবে বিদ্যুতের জোগান পাওয়া যায়। এছাড়া স্কুলের ভিতরের দেওয়াল চুন দিয়ে প্লাস্টার করা, যা ইনসুলেটরের কাজ করে। স্কুলের বাইরের দিকের দেওয়ালে কোনও জানলা রাখা হয়নি। সমস্ত জানলাই ভিতরের দিকে। তাই হাওয়ার সঙ্গে বালি উড়ে এসে স্কুলের ভিতরে ঢোকার কোনও উপায় নেই। স্কুলের ভেতর জল সংরক্ষণ ও বৃষ্টির জল ধরে রাখার ব্যবস্থাও করা আছে। বছরে প্রায় ৩.৫ লক্ষ লিটার জল ধরে রাখা যাবে এমন ট্যাঙ্ক স্কুলের ভেতরে রাখা হয়েছে। সব মিলিয়ে স্কুলের ভেতর এমন একটা পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে যা দেখলে সত্যিই বিস্মিত হতে হয়।

অন্দরমহল

জয়সলমীরের কানোই গ্রামে হলুদ বেলেপাথরের তৈরি এই স্কুলটি বানিয়েছেন মার্কিন স্থপতিরা। আমেরিকান সংস্থা সিআইটিটিএ-র অর্থসাহায্যে তৈরি হয় এই স্কুল। স্কুলবাড়ির নকশা তৈরি করেন নিউইয়র্কের অভিজাত মহিলা ডায়ানা কেল্লগ ও তাঁর স্বামী মাইকেল দৌবে। ২০১৪ সালে প্রথমবার রাজস্থানে ঘুরতে এসে সেখানকার স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও অধিবাসীদের জীবনযাত্রা ডায়ানাকে প্রভাবিত করে। একই সঙ্গে রাজস্থানের মানুষের মধ্যে অশিক্ষা, কুসংস্কার ইত্যাদি বিষয়গুলি তাঁকে ভাবিয়ে তোলে। এই দুইয়ের মধ্যে একটা সূত্র খুঁজতে গিয়ে তাঁর মাথায় প্রথম এই স্কুল তৈরির পরিকল্পনা আসে। যে স্কুলের ভাস্কর্য মুগ্ধ করবে গোটা বিশ্বকে, আবার একইসাথে সেই স্কুলে পড়াশোনার সুযোগ পাবে বহু গরীব, মেধাবী পড়ুয়ারা।

স্কুলের নির্মাণকাজের সময় মাইকেল ও ডায়ানা

২০১৮ সালে অক্টোবরে মরুভূমির মাঝে এই স্কুল বানানোর কাজ শুরু করা হয়। নাম দেওয়া হয় রাজকুমারী রত্নাবতী গার্লস স্কুল। রাজস্থানের গরীব ও পিছিয়ে পড়া মেয়েদের এখানে বিনামূল্যে শিক্ষাদান করা হয়। জয়সলমীর ও তার আশেপাশের অনেকগুলি গ্রাম থেকে প্রায় চারশোর ওপর মেয়েরা এখানে পড়তে আসে। স্কুলের ভেতরেই মেয়েদের থাকার জন্য আলাদা জায়গা করে দেওয়া হয়েছে।

রাজকুমারী রত্নাবতী স্কুল শুধু ভারতবর্ষ নয়, গোটা বিশ্বের দরবারে প্রশংসনীয় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। ৯ হাজার বর্গফুটের বিশাল এই স্কুলবাড়িটির প্রত্যেকটা দেওয়ালে স্থানীয়দের আঁকা সূক্ষ্ম কারুকার্য রয়েছে। এই স্কুলে যেসব গরীব মেয়েরা পড়তে আসে তাদের অনেকেরই বাবা অথবা আত্মীয়স্বজন পাথরের কাজ করেন। তাঁদেরই অনেকে এই হলুদ বেলেপাথর জোগাড় করে দিয়েছেন। সমগ্র স্কুলটি পরিচালিত হয় জিওথার্মাল শক্তি ব্যবহার করে। এই স্কুলে ‘জ্ঞান সেন্টার’ নামে একটি বিশাল কমপ্লেক্স আছে, যেখানে স্কুলের ছাত্রী ও রাজস্থানী মহিলাদের হাতে তৈরি বিভিন্ন জিনিস প্রদর্শন করা হয়। এছাড়া স্কুলের ভেতর একটি বিশাল অডিটোরিয়াম এবং মিউজিয়ামের সু-বন্দোবস্ত আছে।

রাজস্থান ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম রাজ্য। রাজস্থানের প্রত্যন্ত গ্রামগুলিতে, যেখানে নারীশিক্ষার হার তলানিতে (সরকারি সমীক্ষা অনুযায়ী ৩২%); অন্ধবিশ্বাস আর কুসংস্কারের পর্দা টাঙানো প্রতিটা ঘরে ঘরে, সেখানে ছোটো বয়স থেকেই মেয়েদের স্কুলমুখী করে তোলার এই প্রচেষ্টা– সত্যিই একজন ভারতবাসী হিসেবে গর্ব করে বলতে হয় অসাধ্য সাধনের আরেক নাম ডায়ানার এই ‘সোনার কেল্লা’।

তথ্যসূত্র: