ব্রিটিশরা যখন সুকৌশলে একে একে গোটা ভারতীয় উপমহাদেশকে নিজেদের ক্ষমতায় নিয়ে আসার প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছে, তখনও কিছু এলাকা ছিল যেখানে ব্রিটিশরা নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে উঠতে পারেনি। ব্যাপারটা দুভাবে ভাগ করে বোঝানো যেতে পারে। একদিকে ছিল ব্রিটিশ সরকারের অধীনস্থ ভারতীয় প্রদেশ। এখানে কেবল ব্রিটিশ কোম্পানির বড়লাটরাই আইনকানুন বা শাসন করতে পারতেন। আর একদিকে ছিল কিছু স্বাধীন দেশীয় রাজ্য, যেখানে শাসন করতেন তখনকার মহারাজারা। নামে ‘স্বাধীন’ হলেও, এখানকার মহারাজদের ‘স্বাধীন’ শাসনের জন্য ব্রিটিশদের দেওয়া কিছু শর্ত মেনে চলতে হত। অর্থাৎ এইসব রাজাদের কাছে ব্রিটিশদের বশ্যতা একপ্রকার স্বীকার করে নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকত না। ফলে প্রত্যক্ষে না হলেও, পরোক্ষে দেশীয় রাজ্যসমূহের উপরেও ব্রিটিশ সরকারের কর্তৃত্ব বিস্তৃত ছিল।

ব্রিটিশ ভারতে স্বাধীন রাজাদের সংখ্যা নেহাত কম ছিল না। নয় নয় করে হলেও মোট ৫৬৫টি দেশীয় রাজ্য বা ‘Princely state’ ছিল ব্রিটিশ ভারতে। এদের মধ্যে জাঁদরেল রাজ্য হিসেবে পরিচিত ছিল হায়দ্রাবাদ, জুনাগড়, কাশ্মীর, পাতিয়ালা ইত্যাদিরা। এসব রাজ-রাজরাদের বিশাল মাপের প্রাসাদ, ধনদৌলত, প্রাইভেট সার্কাস দেখে তখনকার দিনে যেকোনো ধনী ব্যক্তিই ঈর্ষা বোধ করতেন। আয়তনের হিসেবে ভারতীয় ভূখণ্ডের শতকরা ৪০ ভাগ ছিল এদেরই দখলে। সেই সময়ে ভারতের মোট জনসংখ্যা ছিল ৩৯ কোটি। তার মধ্যে প্রায় ৯ কোটি মানুষ ছিলেন দেশীয় রাজ্যের আওতায়। এই ৯ কোটি মানুষের কেউই তাঁদের জীবদ্দশায় ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলার সাহস করতেন না। 

তৎকালীন ভারতবর্ষের ব্রিটিশ শাসিত রাজ্য ও দেশীয় রাজ্য (উন্নত কোয়ালিটিতে দেখার জন্য ছবির ওপর ক্লিক করুন)

আগেই বলেছি এইসব রাজাদের রাজত্ব পরিচালনার জন্য ব্রিটিশদের বৈদেশিক নীতি ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত কিছু শর্ত আগে থেকেই মেনে নিতে হত। তাছাড়া নির্দিষ্ট সময় অন্তর প্রজাদের থেকে খাজনা আদায় করে সেখান থেকে একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ ভ্যাট হিসেবে ব্রিটিশ ভান্ডারেও জমা করতে হত তাঁদের। এইসব দেখাশোনার জন্য প্রত্যেক রাজত্বে নিযুক্ত থাকত একজন ব্রিটিশ কর্মচারী। প্রয়োজনে সে-ই বড়লাটের সঙ্গে রাজাদের যোগাযোগ করিয়ে দিত। এইরকম আনুগত্যের বিনিময়ে রাজারা পেতেন বিরল রাজকীয় সম্মান, তোপধ্বনি, পদক, উপাধি– আরও অনেক কিছু! ব্রিটিশদের প্রতি আনুগত্যের পুরস্কারস্বরূপ এইসব রাজাদের সম্বোধন করা হত ‘হিজ হাইনেস’ বলে। এতকিছুর ফলে ব্রিটিশদের অনুগত হয়ে রাজারাও নিজেদের সাধ্যমত তাঁদের তোয়াজ চালিয়ে যেতেন।

এ তো গেল পূর্বকথন। এবার আসি আসল কথায়। যে সময়ের কথা বলছি, তখন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন একেবারে শেষ পর্যায়ে। ভারতবাসীর কাছে ‘স্বাধীনতা’ শব্দটা আর কয়েক মাসের অপেক্ষামাত্র। ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দের ১৬ই মে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট এটলি-র প্রেরিত মন্ত্রী মিশন বা ক্যাবিনেট মিশন তিনটে উল্লেখযোগ্য নীতি প্রণয়নের কথা বলে: এক, ভারতবর্ষ স্বাধীন হওয়ার পর দেশীয় রাজ্যগুলির ওপর ব্রিটিশ আধিপত্যের অবসান ঘটবে। দুই, স্বাধীনতার পর ব্রিটিশ-শাসিত ভারত ও দেশীয় রাজ্যগুলিকে নিয়ে একটি ‘ভারতীয় ইউনিয়ন’ গঠন করা হবে। তিন, বিদেশ নীতি নির্ধারণ, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপরে এই ভারতীয় ইউনিয়ন সরকারের কর্তৃত্ব বজায় থাকবে এবং অন্যান্য বিষয়ে দেশীয় রাজ্যগুলিতে নিজ নিজ শাসকদের অধিকার বজায় থাকবে। দেশীয় রাজ্যের রাজারাও ক্যাবিনেট মিশনের সুপারিশের উত্তরে বলেন, ভারত ইউনিয়নে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে তাঁদের সিদ্ধান্তকেই মান্যতা দিতে হবে। বিনিময়ে সব দেশীয় রাজাদের হারিয়ে যাওয়া ক্ষমতা পুনরায় তাঁদের ফিরিয়ে দিতে হবে।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট এটলি

এরপর ১৯৪৭ সালের ৪ ঠা জুলাই ইংল্যান্ডের অ্যাটর্নি জেনারেল হার্টলে শক্রস্ এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট এটলি ব্রিটিশ পার্লামেন্টে একটি আইন পাশ করেন, যার নাম ‘ভারতীয় স্বাধীনতা আইন’। মন্ত্রী মিশনের নীতিগুলি সমর্থন করে ওই আইনে বলা হল, ভারতে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর দেশীয় রাজ্যগুলির সঙ্গে ব্রিটিশ সরকারের সম্পাদিত চুক্তির অবসান ঘটবে। দেশীয় রাজ্যগুলির কাছে দুটি রাস্তা খোলা আছে: হয় তারা ভারত বা পাকিস্তান যেকোনো একটি প্রদেশের আওতায় আসবেন, না হয় নিজেদের রাজ্যের স্বাধীন সত্ত্বা বজায় রাখবেন।

যে দুটি দেশ নিয়ে কথা হচ্ছে, অর্থাৎ ভারত ও পাকিস্তান– সেই সময়ে ভারতের সর্বেসর্বা জাতীয় কংগ্রেসের জহরলাল নেহরু, এবং পাকিস্তানের সর্বেসর্বা মুসলিম লীগের মহম্মদ আলি জিন্নাহ্। আর এদের মাঝে মধ্যস্ততা করার জন্য বসে রয়েছেন ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড লুই মাউন্টব্যাটেন। ভারতীয় স্বাধীনতা আইন পাশ হওয়ার পর জহরলাল নেহরু উপলব্ধি করেন ভারতের অভ্যন্তরভাগে অবস্থিত কোনো দেশীয় রাজ্য পাকিস্তানে যোগ দিলে তা স্বাধীন ভারতের সার্বভৌমত্বের পক্ষে বিপজ্জনক হবে। আবার কোনো দেশীয় রাজ্য যদি ভারত বা পাকিস্তান কোনোটাতেই না গিয়ে সম্পূর্ণ স্বাধীন থাকতে চায়, তাহলে সেই দেশীয় রাজ্যগুলির অস্তিত্ব বিপন্ন হবে, এমনকি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সশস্ত্র সংঘাতের সম্ভাবনাও বাড়বে।

অনেক ভাবনাচিন্তা, আলাপ-আলোচনা করার পর ১৯৪৭ সালের ১৫ জুন জাতীয় কংগ্রেসের তরফে সমস্ত দেশীয় রাজ্যকে ভারতভুক্তির আবেদন জানানো হয়। এই উদ্যোগকে সফল করার জন্য ‘দেশীয় রাজ্য দপ্তর’ নামে এক দপ্তর গঠন করা হয়। দপ্তরের দায়িত্ব নেন নেহরুর বিশ্বস্ত বন্ধু ও জাতীয় কংগ্রেসের নেতা সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল।

জহরলাল নেহরু ও ‘ভারতের লৌহমানব’ বল্লভভাই প্যাটেল

শুনতে যতটা সহজ মনে হচ্ছে, বাস্তব পরিস্থিতিটা ছিল তার থেকেও ঢের কঠিন। একটা-দুটো রাজ্য তো আর নয়, গুনে গুনে ৫৬৫ টি দেশীয় রাজ্যকে ভারতের আওতায় আনতে হবে। আর এই কাজে নেহরু, প্যাটেলকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন স্বয়ং লর্ড লুই মাউন্টব্যাটেন এবং ভি. পি. মেনন। ভি. পি. মেনন তখন স্বরাষ্ট্র দপ্তরের সেক্রেটারি পদে কর্মরত। বল্লভভাই প্যাটেল প্রথমে বিনীতভাবে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সকল দেশীয় রাজ্যগুলিকে ভারতভুক্তির আবেদন জানান। এর ফলে এক ধাক্কায় একশোরও বেশি রাজ্য ভারতের আওতায় চলে আসে।

রইলো বাকি চারশোর কিছু বেশি রাজ্য। এই তালিকায় ছিল জুনাগড়, হায়দ্রাবাদ, কাশ্মীর বা মধ্যপ্রদেশের মত শক্তিশালী ও বৃহৎ রাজ্য। এদের কারোর কারোর আয়তন ছিল সেই সময়কার ফ্রান্সের আয়তনের কাছাকাছি। এরা ভেতরে ভেতরে চাইছিল পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার, আর তা না হলে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে শাসন করার। কোনো কোনো রাজ্যের রাজারা, যেমন জুনাগড় বা হায়েদ্রবাদের নবাবরা, কারোর সাথে কোনোরকম আলোচনা ছাড়াই নিজেদের স্বাধীন বলে ঘোষণা করে দেন। এইসব রাজ্যের রাজারা বুঝতে পেরেছিলেন ছলে-বলে-কৌশলে ভারত সরকার তাঁদের ভারতে যোগ দেওয়ার কথা বলবেন। কিন্তু ভুলেও সেই ‘টোপ’-এ যদি তাঁরা পা দেন, রাতারাতি এইসব স্বাধীন নবাবদের ক্ষমতার অবলুপ্তি ঘটবে। 

ভারত স্বাধীন হতে তখন আর কয়েকদিন বাকি। নেহরু-প্যাটেল দুজনেই চিন্তিত। দিল্লিতে স্বরাষ্ট্র সচিবের দপ্তরে, নেহরুর বাসভবনে বারবার বৈঠক বসছে। তখন পরিস্থিতি এমনই যে, দেশীয় রাজ্যগুলিকে ভারতে সামিল করতে না পারলে আজকের ভারতের মানচিত্র দেখতে হত অনেকটা পোকায় খাওয়া কাগজের টুকরোর মত।

পোকায় খাওয়া মানচিত্রের প্রতিলিপি। দেশীয় রাজ্যগুলিকে ভারতে অন্তর্ভুক্ত করতে না পারলে হলুদ জায়গাগুলি নিয়ে তৈরি হত আজকের ভারত। আর মাঝখানে নীল জায়গাগুলি হত অন্য এক একটি দেশ।

এদের বাগে আনতে সর্দার প্যাটেল কঠোর সামরিক নীতি প্রয়োগের হুমকি দেন। তিনি বলেন এইসব দেশীয় রাজ্যগুলি যদি এখনও ভারতের অন্তর্ভুক্ত হতে না চান তাহলে ভারত সরকার বাধ্য হয়েই তাদের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। আর একবার সরকারের সাথে এইসব রাজ্যের যুদ্ধ লেগে গেলে দেশীয় প্রজারাও শাসকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে তা বলাই বাহুল্য। তাছাড়া দেশীয় রাজ্যগুলি যদি ভারতে অন্তর্ভুক্তির চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেন তবে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে উপহারস্বরূপ এককালীন নগদ টাকাও দেওয়া হবে বলে ঘোষণা করেন তিনি।

এই হুমকির ফলে কাজ হয়। রাজস্থানের বিকানীর, বরোদা সহ কয়েকটি আঞ্চলিক রাজ্য ভারতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে। ভারত স্বাধীন হওয়ার তিন সপ্তাহের মধ্যে প্রায় সমস্ত দেশীয় রাজ্য ভাতা, খেতাব ও অন্যান্য সুযোগসুবিধার প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে ‘ইন্সট্রুমেন্ট অফ অ্যাক্সেশন’ (Instrument of Accession) নামে ভারতভুক্তির দলিলে স্বাক্ষর করে।

দেশীয় রাজ্যগুলি ভারতে যোগ দিলেও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বেশ কিছু ফরাসি ও পোর্তুগিজ উপনিবেশ রয়ে যায়। এদের মধ্যে বাংলার চন্দননগর, মাদ্রাজের পণ্ডিচেরি, পশ্চিম উপকূলে মাহে ইত্যাদি ফরাসি উপনিবেশ এবং গোয়া, দমন ও দিউ, দাদরা ও নগর হাভেলি ইত্যাদি পোর্তুগিজ উপনিবেশের নাম উল্লেখযোগ্য। ফরাসি সরকার বেশ কয়েক দফা আলোচনার পর তাদের উপনিবেশগুলি স্বাধীন ভারতের হাতে তুলে দিতে রাজি হন। কিন্তু বাধ সাধে পোর্তুগিজরা। ইংল্যান্ড ও আমেরিকার গোপন মদতে প্রথমটায় তারা ভারতে অন্তর্ভুক্ত হতে চাননি। তারা চাইছিলেন নিজেদের স্বাধীন প্রদেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে। কিন্তু শেষ অবধি বল্লভভাই প্যাটেলের অনুরোধে ও পরে সেনাবাহিনীর সাহায্য নিয়ে ভারত সরকার গোয়া ও পোর্তুগিজ অধিকৃত অন্যান্য অঞ্চলগুলির দখল নেয়।

লর্ড লুই মাউন্টব্যাটেন ও সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল

‘এ যেন এক নাটকের চিত্রনাট্য’... যার পরতে পরতে লুকিয়ে আছে রহস্য আর রোমাঞ্চের গন্ধ। নেহরু-প্যাটেল সেই সময় উদ্যোগী না হলে আজকের ভারতের অবস্থানটা কেমন হত তা জানি না! দেশীয় রাজ্যগুলিকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করার এই সুদীর্ঘ লড়াইয়ের সাফল্যটা তাই রাখা থাক সেই দুজনেরই নামে।

তথ্যসূত্র: